Friday, April 23, 2021

রিসোর্স ও অ্যাবিলিটি


কারও কোনোকিছু করতে পারা বা না পারার বিষয়টি তার রিসোর্স ও অ্যাবিলিটির উপর নির্ভর করে। আর রিসোর্স ও অ্যাবিলিটি মিজারমেন্টের বিষয়টি তো তোমরা এই অল্প বয়সে করতে পারবে না। সেটা করার মতো জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তোমাদের নেই। তাই এই বিষয়ে তোমাদেরকে অভিজ্ঞ ও সিনিয়র কারো পরামর্শ নিতে হবে। তারা তোমার কনফিগারেশন পরিমাণ করে তোমাকে লাইফের পরিকল্পনা করতে সহায়তা করবে।
এক্ষেত্রে সেই কাজে তোমাকে যেই হেল্প করুক না কেনো সে যেনো তোমার PRC (Personal Real Condition) টেস্ট করে পরামর্শ দেয়। আর পারসোনাল রিয়েল কন্ডিশন যে পদ্ধতির মাধ্যমে টেস্ট করা হয় লাইফ একাডেমিতে সেটাকে বলা হয় PAPLD Game তথা, Personal Advising Program for Life Development। এই বইয়ের শেষে ব্যবহারিক অংশে PRC Test এর পদ্ধতি ও এর নিয়ামকসমূহের বিষয়ে বলা হয়েছে।

টিউশনি ও পার্টটাইম জব


একজন কনজারভেটিভ ফ্যামিলির সন্তানের উচিৎ ১৬ বছর বয়স থেকেই পড়াশুনার পাশাপাশি অর্থ উপার্জন করে অর্থ সঞ্চয় করা শুরু করা। এক্ষেত্রে টিউশনি একটি জনপ্রিয় পন্থা। টিউশনি কোনোভাবেই পাওয়া না গেলে পার্টটাইম জব করে অর্থ সঞ্চয় শুরু করতে হবে।
তুমি দুর্দিনে এসে টিউশনি খুঁজলে হঠাৎ করে টিউশনি পাবে না। আর টিউশনি খোঁজার বিষয়ে অনলাইনের লেখা কিংবা ইউটিউবের ভিডিওতে যেসব সুন্দর ও সুস্বাদু পরামর্শ পাবে সেসবের অধিকাংশই অকার্যকর পদ্ধতি যা শুধু তোমাকে মুগ্ধ করার জন্য বলা হয়ে থাকে, বাস্তবে সেসব পদ্ধতি ফল দেয় না। যেমন- দেয়ালে "পড়াতে চাই" এর পোস্টার লাগানো। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে এই পদ্ধতি বেশ ভালো ফল দিতো; কিন্তু এখন এটা করে তেমন একটা ফল মেলে না, এর কারণ হলো অভিভাবকরা বিশ্বস্ত সুত্রে কারো রেফারেন্স ধরে টিউটর নিতে চায় আর আজকাল আবাসিক এলাকাগুলোতে এতো বেশি পরিমাণে "পড়াতে চাই" এর কাগজ লাগানো থাকে যে সেখান থেকে তোমাকেই যে একজন অভিভাবক সিলেক্ট করবে এরূপ কোনোই নিশ্চয়তা নাই। আবার অন্যকেউ তার পোস্টার লাগানোর সময় তোমার পোস্টার ছিঁড়েও ফেলতে পারে, তুমি তো আর সেখানে পাহাড়ায় থাকবে না। আমি মাস্টার্স এ পড়ার সময় একটা ক্লাস ওয়ান এর বাচ্চার টিউশনি পেয়েছিলাম; শহরের মূল রোড হতে সেই বাড়ির গলির যে ৩০০ গজ দূরত্বের পথ সেটাতেই প্রায় ১০ জনের "পড়াতে চাই" পোস্টার ছিল। কিন্তু আমি টিউশনিটা পেয়েছিলাম রেফারেন্স ধরে।
তাই টিউশনি পেতে তোমার যে বন্ধু কিংবা বড়ভাই টিউশনি পেশায় খুব বেশি জনপ্রিয় তার কাছে বলে একটা টিউশনি জোগাড় করে নাও। এরূপ কাউকে বলার পর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তথা পরের মাসেই তুমি টিউশনি পেয়ে যেতে পারো। আর যদি না পাও তাহলে বুঝে নেবে সে আসলে তোমার জন্য কিছুই করে নাই, মুখের উপরে "পারবো না" বললে তুমি কষ্ট পাবে বলে শুধুই তোমাকে 'হবে হবে' বলে আশ্বাস দিয়েছে। এজন্য কয়েকজন বন্ধু ও কয়েকজন বড়ভাইকে বলে রাখো এবং তাদের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখো। শুধু দু'একজনের উপর ভরসা করে থাকবে না।
আরেকটা বিষয় হলো তুমি যদি এসএসসি থেকেই মানবিকে পড়া ছাত্র হয়ে থাকো তাহলে তোমার টিউশনি পাওয়ার স্পেসটা খুবই সীমিত। তুমি এক্ষেত্রে ছোট বাচ্চাদের টিউশনি পেতে পারো আর এটা খুব সীমিত একটা সুযোগ। তাই বুঝতেই পারছো এক্ষেত্রে সময় বেশি লাগবে। আর এক্ষেত্রেও অন্যদের রেফারেন্সে টিউশনি পাওয়াটাই বেশি ফলপ্রসূ কারণ আজকাল সবাই বিশ্বস্ত রেফারেন্স থেকেই টিউটর নিতে চায়। এর কারণ হলো অনেক বাসা ছিনতাইকারী কিংবা শিশু অপহরণকারী টিউটর সেজে শিশুকে পড়াতে গিয়ে গল্পচ্ছলে শিশুদের সরলতার সুযোগে শিশুদের কাছ থেকে বাসা সম্পর্কে তথ্য নিয়ে ওই বাসার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা হ্যাক করে ফেলে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে শিশুকেই ভুলিয়ে ভালিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে থাকে। তাই তুমি শিশুকে পাড়ানোর জন্য পোস্টার লাগিয়ে সফল হবে এই ভাবনা ছেড়ে দিয়ে রেফারেন্সে শিশুর টিউশনি পাওয়ার চেষ্টা করো এবং কয়েকজন বন্ধু ও বড়ভাইকে বলো। আর শুধু শ্যালশ্যালাভাবে বললেই হবে না, তাদের সাথে যোগাযোগ রাখো। এসব বিষয়ে সাফল্যের মূল শর্তই হলো কমিউনিকেশন এর শক্তি।
আর যদি কয়েকজকে বলেও ফল না হয় তাহলে কোনো বিশ্বস্ত ও খাঁটি টিউশন মিডিয়ায় গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে তাদের মাধ্যমে টিউশনি নিয়ে নাও। টাকা খরচ হলেও এতে কাজ হবে এটাই ভরসা। তবে আগে খোঁজখবর নিয়ে দেখো টিউশন মিডিয়াটা রিয়েল কিনা।

পার্টটাইম জব বিষয়ে বলতে গেলে প্রথমেই একটা কথা বলতে হয় সেটা হলো পার্টটাইম জব বিষয়ে তরুণদের একটি কাল্পনিক ও ভুল ধারণা আছে তা হলো এসব তরুণেরা ভেবে থাকেন পার্টটাইম জব মানে ফুলটাইম জব এর অর্ধেক কাজ করা অর্থাৎ ফুলটাইম জবে অফিসে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করতে হয়, তাহলে পার্টটাইম জব মানে কোনো অফিসে ফুলটাইম এর অর্ধেক সময় অর্থাৎ চার ঘন্টা কাজ করা। এটা প্রায় পুরোটাই ভুল ধারণা। এরূপ কোনো চাকরি বাজারে নেই বললেই চলে। এরূপ চাকরি বাজারে আছে ঢাকা শহরে অল্প কিছু আর অন্যান্য শহরে তা ২-৪% হবে। পার্টটাইম জব মানে তা ফিল্ডের জব হবে এবং তাতে টার্গেট কিংবা পারসেন্টেজ ভিত্তিতে সম্মানী নির্ধারিত হবে; এটাই হলো পার্টটাইম চাকরির বাজারের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এটা তরুণেরা জানেনা বলে অহেতুক আবেদন করে সেসব অফিসে গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে তারপর বিষয়টা বুঝতে পারেন। এভাবে তারা নিজেদের সময় যেমন নষ্ট করেন তেমনি নিয়োগদাতাদের সময়ও নষ্ট করে থাকেন।
একবার রংপুর শহরে একটি প্রজেক্ট হাতে নিয়ে কিছু ছেলেকে নিয়োগ দেবো বলে ভাইভা নেওয়া শুরু করলাম। এতে তরুণদের ধ্যান ধারণা দেখে বেশ অবাক হলাম। ফিল্ডে কাজ করার ইচ্ছে তাদের নাই। তারা অফিসে বসে পার্টটাইম জব আশা করে। আর যারা ফিল্ডে কাজ করতে একটু একটু চায় তারা আবার বাইসাইকেল চালাতে চায় না। তারা কাজ করার আগেই ফিল্ডে ঘোরার জন্য রিকশা রিজার্ভ করার টাকা আশা করে এবং নাস্তা খরচ ও ফিক্সড বেতন আশা করে। যখন জানানো হয় যে, বেতন কিক্সট হবে না, যেমন পারফরমেন্স করবেন তেমন আয় করবেন তখন কেউ রাজি হয় না। করবে পার্টটাইম জব আর তাতে সুযোগ সুবিধা আশা করে সরকারি চাকরির মতো, যেটা একটা অবাস্তব প্রত্যাশা।
চাকরি সম্পর্কে এসব তরুণদের কোনো ধারণাই নাই। তারা চাকরি জিনিসটাকে পাশের গ্রামের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচ খেলার মতো মজাদার জিনিস মনে করে থাকেন। কিন্তু চাকরি জিনিসটা মোটেও সেরকম কোনো জিনিস নয়। চাকরি মানে একটা কাজ। চাকরি করা মানে চুক্তির কিষাণ হিসেবে কাজ করা। চাকরিজীবী মানে সে একজন কিষাণ-কামলা; পার্থক্য শুধু গ্রামে জমিতে যারা কিষাণের কাজ করে তারা অশিক্ষিত কিষাণ আর যারা কোম্পানি কিংবা প্রাইভেট জব করেন তারা শিক্ষিত কিষাণ।
তাই চাকরি জিনিসটাকে যেসব তরুণেরা চকলেটের মতো মজাদার সুস্বাদু জিনিস মনে করো তারা আজকে মাথায় এটা ঘুমিয়ে নাও ও এই ভাবনাটা ইন্সটল করে রাখো যে চাকরি জিনিসটা তোতো ঔষধের মতো একটা জিনিস; এটাতে তুমি যত দ্রুত অভ্যস্ত হতে পারবে ততই তুমি অ্যাডভান্সড হয়ে উঠবে।
সেজন্য এটা জেনে রাখো যে, তুমি যদি সেই কাল্পনিক বিশ্বাস থেকে অফিসে বসে চারঘণ্টা কাজ করার পার্টটাইম জব খুঁজতে থাকো তাহলে শুধু খুঁজতেই থাকবে, পার্টটাইম জব আর পাবে না।
পার্টটাইম জব কোথায় কোথায় পাওয়া যায় সে বিষয়ে অনলাইনে কিংবা ইউটিউবে অনেক তথ্যমূলক লেখা ও ভিডিও পাবে।
আর পার্টটাইম জবে জয়েন করার ক্ষেত্রে কী কী বিষয়ে সচেতন থাকবে তা এই অধ্যায়ের তৃতীয় পাঠে জানতে পারবে।

Thursday, April 22, 2021

পাঠ—৪ বেসলেস অ্যাসপেকটেশন সমস্যা


আজ আমি একটা অসাধারণ তত্ত্ব ব্যাখ্যা করবো আমি যেটার নাম দিয়েছি "Baseless Expectation" বা ভিত্তিহীন প্রত্যাশা। আমরা মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানেরা যে সমস্যাটা মাথায় নিয়ে জন্মাই ও সারাজীবন ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে বেড়াই সেটা হলো এই Baseless Expectation।
আমাদের শিক্ষাজীবনে স্কুল কলেজে শিক্ষকেরা ক্লাসে আমাদেরকে শেখায় ভাত রান্না করা, আর পরীক্ষার খাতায় তারা আশা করেন বিরানী। তাদেরকে এই বিরানী দিতে গেলে বাইরে এক্সট্রা প্রাইভেট পড়ে বিরানী বানানো শিখতে হয় যেটা উচ্চবিত্তের সন্তানেরা পারে আর মধ্যবিত্তের সন্তানেরা কিছুটা পারে কিছুটা পারেনা।
পরিবারও একই কাজ করে। তারা যে পরিমাণ সাপোর্ট দিতে পারে সেটা হলো ভাত রান্না করার চাল, আর তারা ফলাফল আশা করে বিরানী। ভালো মেধা থাকলে ও সেইসঙ্গে লাক সাপোর্ট করলে সেই বিরানী দেওয়া সম্ভব হয়, নয়তো হয় না। পরিশ্রম করলেই সফলতা আসে এই সুত্র সব জায়গায় সবসময় খাটে না।
আর আজ থেকে কয়েক বছর পর তরুণ প্রজন্মের আত্নহত্যার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে এই Baseless Expectation; এর বিভিন্ন দিক এখন তুলে ধরা যাক:—
প্রথমত, আমাদের সমাজের একটা বৈশিষ্ট্য হলো আমরা বাবা-মায়েরা যেটা পরি না সেটা সন্তানের উপর চাপিয়ে দেই; সন্তানের মাধ্যমে সেই ইচ্ছা পূরণ করতে চেষ্টা করি। এখন কথা হলো স্বপ্নের জায়গাগুলো তো আর সহজ হয় না, বরং দিন দিন তা কঠিন হচ্ছে, কারণ জনসংখ্যা বাড়ছে। আর যারা সেই স্থানে গিয়েছিল তারাও তো চাইবে তাদের সন্তানেরা সেই স্থানটা ধরে রাখুক। আমরা যারা সন্তানের দ্বারা স্বপ্ন পূরণে আশাবাদী তারা হয়তো সন্তানের উপর বিনিয়োগ বাড়িয়ে দিয়েছি, তবে আমরা মোট বিনিয়োগ বাড়িয়েছি প্রান্তিক হারে বাড়াইনি, অর্থাৎ আমাদের বাবা মা যে বিনিয়োগ আমাদের উপর করেছিল সেই মাত্রার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছি কিন্তু সেই পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারছি না যে পরিমাণ বিনিয়োগ যারা স্বপ্ন পূরণ করে তাদের সন্তানের দ্বারা সেই স্বপ্নের স্থানটা ধরে রাখার জন্য করছে।
দ্বিতীয়ত, পারসোনাল আবেগ। অনেক সময় দেখা যায় শক্তিতে দূর্বল হওয়ায় কেউ অন্যের অনেক অত্যাচার অনাচার সহ্য করে এবং স্বপ্ন দেখে তার সন্তান লেখাপড়া করে বড় হয়ে উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে এই অন্যায়ের বদলা নেবে; কিন্তু এটা নিতান্তই পারসোনাল আবেগ। বাস্তবতার কাছে পারসোনাল আবেগের কোনো মূল্য নেই।
তৃতীয়ত, কষ্টের আবেগ। যেহেতু মধ্যবিত্ত অভিবাবকেরা কষ্টের ইনকামের টাকা সন্তানদের উপর ব্যয় করেন তাই তাদের আবেগটা একটু বেশি। কিন্তু বাস্তবতার কাছে এটাও নিতান্তই তুচ্ছ আবেগ। টাকা তো টাকাই, সেটা কষ্টের টাকা হোক আর ঘুষের টাকা হোক, বাজারে সব টাকা মূল্য একই; কষ্টের টাকায় তো আর আলাদা সিল মারা থাকে না। তাই বাস্তবতার কাছে এই আবেগও মূল্যহীন।
চতুর্থত, প্রতীক্ষার আবেগ। অনেক মধ্যবিত্ত অভিবাবকের ইচ্ছা তার ছেলে লেখাপড়া শেষ করেছে, এবার সে চাকরি করে বাড়ি করবে তারপর বিয়ে করবে। তারা ভাবে ছেলেকে এতদূর লেখাপড়া না করালে এতদিন সে মাঠে কাজ করে কিংবা গার্মেন্টসে চাকরি করে যে ইনকাম করতো ও লেখাপড়ায় ব্যয় হওয়া যে অর্থটা সেভ হতো তাতে বাড়ি করা হয়ে যেতো। তাদের প্রত্যাশাটা যৌক্তিক আছে, কিন্তু এতে একটা রূঢ় দাবিত্ব আছে। এই সময়ে সাধারণ কোনো চাকরি করে টাকা জমিয়ে বাড়ি করতে চাইলে ৬ বছর সময় লাগে। তাই দেখা যায় এই ইচ্ছা পূরণ করতে গেলে ছেলেটার কোনো প্রেমিকা থাকলে তাকে হারাতে হয়। প্রেমিকা হারানোর কষ্ট অভিবাবকেরা কোনোদিন বুঝবেন না। হয়তো সে বিয়ে করে শহরে ভাড়া বাড়িতে থাকতো ও ধীরে সুস্থে অভিবাবকের ইচ্ছা পূরণ করতো। কিন্তু পাশের বাড়ির আবুলকে ভালো বাড়ি করতে দেখে সেই ধৌর্য আর অভিবাবকের থাকে না।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা কী?


বলতে পারেন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা কী?
ব্যবসায় বড় ধরণের লস হওয়া? এক্সিডেন্ট হয়ে কয়েকমাস কোমায় থাকা? ইত্যাদি ইত্যাদি?
না কোনোটাই নয়। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা হলো— ভুল বিশ্বাস নিয়ে জীবন চালানো।
বিষয়টা পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করি— আমার দুর্দশার উদাহরণটাই হতে পারে একটি অন্যতম উদাহরণ।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন আমি কোনো অহেতুক সময় নষ্ট করতাম না। সবসময় কিছু না কিছু শিখতাম ও শেখার কাজে লেগে থাকতাম। আমি তিন বছর শুধু বিভিন্ন জিনিস শিখেই সময় কাটাই। আর আমার একটা বিশ্বাস ছিল যে, পড়াশুনা শেষ করে চাকরি না হলেও নিজেই একটা কিছু করতে পারবো।
এমন কিছু দক্ষতা অর্জনের পর আমি বাকি কিছু সময় ব্যয় করলাম সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার কাজে।
যাহোক পড়াশুনা শেষ করে নিজে কিছু করার জন্য সাপোর্ট পাওয়া দূরে থাক বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেওয়ায় জন্য যে ঢাকায় যাতায়াত করবো সেই টাকাও ফ্যামিলি থেকে পাচ্ছিনা। আত্নীয় স্বজনদের একটা অংশ আমার জন্য বিশেষ পরামর্শ প্রকল্প খুলে বসেছে এবং তাদের প্রতিবেদনের পরামর্শ হলো কোম্পানির চাকরিতে জয়েন করো।
এর আগেই বলেছিলাম বাঙালির বৈশিষ্ট্য হলো কোনোকিছু না জেনে না বুঝেই বা ১০% জেনেই তাতে কমেন্ট করা; অনেকটা সেই কয়েক অন্ধের হাতি দেখার গল্পের মতো। আমি বংশগত সুত্রে কিছু বংশগত ও পরিস্থিতিগত রোগ উপহার পেয়েছি। যেমন- আমার মায়ের অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া ও তার কারণে অকালে গর্ভধারণের জন্য আমার চোখের সমস্যা; চশমা ছাড়া ভালো দেখিনা। সেইসঙ্গে বংশগত সুত্রে উপহার পেয়েছি এলার্জি রোগ; রোদে অল্প একটু গা ঘামলেই সারা শরীর চুলকায়। আমার দাদার কাছ থেকে উপহার পেয়েছি তার হ্যালোজিনেশন ও শর্ট টাইম মেমোরি লসিং নামক ব্রেইন এর রোগ। আমার ঢাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চাঞ্চ ফসকে গেছে এই শর্ট টাইম মেমোরি লসিং ও হ্যালোজিনেশন রোগের কারণে। এছাড়াও পেয়েছি দীর্ঘকালীন আমাশয়। আর মাতৃ তরফ থেকে উপহার পেয়েছি উচ্চমাত্রার গ্যাস্ট্রিক এবং একটি হরমোনঘটিত রোগ।
একজন মানবিকের ছাত্র হিসেবে আমার জন্য কোম্পানির চাকরিতে যেসব অল্প কিছু কাজ আছে সেসব আমার বডি ক্যাপাসিটির সঙ্গে সুইট করে না।

নিজের গল্প নিয়ে হয়তো মূল টপিক হারিয়ে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে। যাহোক, আমার বিশ্বাস ছিল আমার ফ্যামিলি আমার পাশে থাকবে। আমার এই বিশ্বাসের জন্ম হয় কারণ আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো সামর্থ্য ও সম্পদ আমার পরিবারের আছে। কিন্তু এই ভুল বিশ্বাসই আমার জীবনে অলীতভার্সা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমার গ্রামে সালমা ও সীমা নামে দুই বোন আছে। তারা এইচএসসি থেকে গার্মেন্টসে কাজ করে টাকা জমিয়েছে, এখন চাকরি ছেড়ে দিয়ে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। অবশ্য সালমা ফুফু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঞ্চ পাওয়ার পর চাকরি ছেড়ে টিউশনি করাতেন; এখন বরসহ দুজনেই টিউশনি করেই চলেন ও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর সীমা ফুফু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন বলে চাকরিটা রান করেছিলেন।

এখন এটা নিয়ে একটা উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে— তারা মেয়ে হয়ে পারলে আমি কেনো পারবো না?
বিষয়টা হলো, তাদের বাবা উদাসীন ছিলেন তাই জীবনে কী করতে হবে এই বিষয়টা তাদের কাছে পরিষ্কার ছিল; সেই মোতাবেক তারা করেছে।
আমার ফ্যামিলি যদি উচ্চমধ্যবিত্ত না হয়ে দরিদ্র হতো তাহলে এই ভুল বিশ্বাস আমার মাঝে জন্ম হতোনা। তখন আমি সেই মোতাবেকই সবকিছু প্রস্তুত করে নিতাম। কিন্তু এই ভুল বিশ্বাসটা সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিল।

কয়েকদিন একটা স্কুলে অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে ছিলাম। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে গল্প করা অভ্যাসের কারণে ক্ষেপে গিয়ে তাদেরকে বেশকিছু এন্টিবায়োটিক দিয়েছিলাম।
তাদেরকে বলেছিলাম,——— "নিজের দুর্দিনের জন্য এখনই প্রস্তত হও। সায়েন্সের ছাত্র হলে পড়াশুনায় এক্সিলেন্ট হও। কোনো কিছুকে ফাইভ স্টার সিস্টেম দিয়ে মার্ক করা যায় যেখানে ৫ স্টার মানে এক্সিলেন্ট, ৪ স্টার মানে গুড, ৩ স্টার মানে মোটামুটি, ২ স্টার মানে নিম্নমানের আর ১ স্টার মানে খারাপ। আর এই প্রতিযোগিতার যুগে ভালো হয়েও কাজ হবে না, হতে হবে এক্সিলেন্ট। আর এক্সিলেন্ট হলে তুমি বিভিন্ন কোচিংয়ে ক্লাস নিতে পারবে যা তোমার দুর্দিনের সঙ্গী হবে।
আর মানবিক এর ছাত্র হলে সেই সুবিধা সীমিত। তবে তাদের একটা সুবিধা হলো যেহেতু পড়াশুনার চাপ কম তাই সময় করে কিছু কিছু কাজ করে টাকা জমাও ও টাকা জমিয়ে কম্পিউটার কিনে কিছু কাজ শিখে রাখতে হবে— গ্রাফিক্স ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং ইত্যাদি ইত্যাদি, যা তোমার দুর্দিনের সঙ্গী হবে।"

আরেকটা কথাও বলেছিলাম, "তোমরা কি ভাবছো তোমাদের বাবা-মা তোমাদেরকে এখন যেরূপ ভালোবাসে এই ভালোবাসা সবসময় একই রকম থাকবে?
মোটেও না। প্রকৃতির অন্য জিনিসের মতো এই ভালোবাসাও একসময় জীর্ণ শীর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এটা তাদের দোষ নয়, এটা একটা প্রাকৃতিক ব্যাপার। একজন নতুন ডাক্তার যখন তরুণ বয়সে তার প্রাকটিস শুরু করে তার তখনকার লেখা একটা প্রেসক্রিপশন ও তার ২৫-৩০ বছর পরে লেখা আরেকটা প্রেসক্রিপশন পাশাপাশি রেখে দেখলে তুমি বিশ্বাসই করতে পারবে না যে এ দুইটা একই ব্যক্তির লেখা। এটা সে ইচ্ছা করে করেনি, প্রাকৃতিক কারণেই হয়ে গেছে। মানুষ বৃদ্ধ হলে তার চামড়া ঢিলে হয়ে যায়। এটা সে প্রতিদিন একটু একটু করে টেনে চামড়া ঢিলে করেনি, এটা প্রাকৃতিক কারণেই হয়ে গেছে। ভালোবাসাও প্রাকৃতিক কারণে জীর্ণ শীর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ভালোবাসা কোনো ধ্রুব বিষয় নয়, এটা আপেক্ষিক বিষয়।

তাই বলতে হয় জগতে ভালোবাসা বলে কোনোকিছু নেই; এখানে সবকিছুই চলে হিসেব নিকেশ করে। তোমাদের বাবা-মা এখানে তোমাদেরকে পাঠিয়েছে তাদেরও একটা হিসেব নিকেশ আছে। সেই হিসেব নিকেশের বাইরে একটা কিছু করে দেখিও তোমাকে জুতত রাখে নাকি?

জীবনের একটা সময়ে এসে তোমরা প্রেমে পড়বা এবং তখন থেকেই তোমাদের জীবনের সংকটের অধ্যায় শুরু হবে যেটা তোমার একান্ত নিজের সমস্যা।
একটি রূঢ় বাস্তবতা হলো— নিজের একান্ত দুর্দিনে কাউকেই পাশে পাওয়া যায় না। বাবা-মা, অমুক মামা, অমুক খালু, অমুক আঙ্কেল, অমুক ভাই-তমুক ভাই, অমুক বন্ধু-তমুক বন্ধু কাউকেই তখন পাশে পাওয়া যায় না। তাদের অনেকে আবার নিজে সরাসরি "না" না বলে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে উধাও হয়। দরকারের সময় তাদেরকে হ্যাজাক লাইট লাগিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না।
তাই নিজের কর্মদক্ষতাই দুর্দিনে টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার। দুর্দিনে মানুষ নিজেই তার একমাত্র বন্ধু, একমাত্র সহযোগী। তুমি যতো ছোট কাজই করোনা কেনো সেটাই হয় একমাত্র অবলম্বন— তা তুমি কাপড় লন্ড্রি করা, চুল-দাড়ি কাটা, রাজমিস্ত্রির সহকারি হিসেবে কাজ করা, রঙমিস্ত্রির কাজ করা, পাইপলাইনের মেকানিক হওয়া যাই করোনা কেনো।"———

ছোটোবেলা থেকে বইপুস্তকে কিছু ভুয়া কথাবার্তা আজ আমাকে এই অবস্থানে এনে দিয়েছে। মাতৃস্নেহ.........। পরিবারের মতো আর........। এটা সেটা বাড়িয়ে বলা কথাগুলো আমার ভুল বিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
তাই পাঠ্যপুস্তকের এসব অতিরঞ্জিত কথাবার্তা সংশোধন করা প্রয়োজন। বাস্তবতার নিরপেক্ষ জ্ঞান দেওয়াই সর্বোত্তম পন্থা।

আমার অনেক দোষ থাকলেও মানুষের টাকা মেরে দেওয়া, মিথ্যা বলা, নেশা করা, স্বার্থপরতা, হিংসা, অহংকার— এসব দোষ নাই। তারপরেও আমি ইন্টারমিডিয়েটে সত্যিই এ+ পেয়েছি নাকি ভং মেরেছি তা আমার এক মামা রোল নাম্বার নিয়ে রেজাল্ট চেক করে দেখেছিল।

অনার্স শেষের সময় একবার আমার হরমোনজনিত সেই রোগটা এতটাই বেড়ে গেলো যে, চারতলায় আমার ডিপার্টমেন্টে উঠতে হলে তারমাঝে দোতলায় উঠার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হয়। কারণ পায়ের রগ কুঁচকে যায়। তখন আমি অসুস্থ মানুষটাকে মামারা পরামর্শ দিল, কোম্পানিতে চাকরি করে বেতন তুলে চিকিৎসা হতে।
মনে হয় আমি কতটা অবহেলিত তা বুঝাতে এর বেশি আর কিছু বলতে হবে না।

পরিবার, সমাজ, একটি মন্দ ভাগ্য এবং বংশগতসুত্রে উপহার পাওয়া কিছু বংশগত রোগ আমার জীবনটাকে এতটাই বিষিয়ে তুলেছে যে সায়ানাইডের বিষ এর কাছে নস্যি; কারণ সায়ানাইড একবারে মারে, আর এসব আমাকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে মারছে।

আমার মাঝে একটা জ্যোতিষীর মতো বৈশিষ্ট্য আছে। অনেক কিছু আমি আগে থেকেই টের পেয়ে যাই। আমার যে আজ এই অবস্থা হবে তা আমি অনেক আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। তাই আমার ইন্টারমিডিয়েট এর মেসের মালিকের ছেলেকে বলেছিলাম, "আপনারা তো পাইপলাইন পরিষ্কারের কাজ করে নেন, আমাকে সেই পাইপলাইন মেকানিকদের ফোন নাম্বার দিন, আমি তাদের সাথে কাজ করবো ও কিছু টাকা সঞ্চয় করবো"। সে ছিল ফ্রিল্যান্সিং এর টিচার। সে আমাকে তার মেসের অন্যতম ভালো ছাত্র হিসেবে চিনতো। তাই সে আমাকে বললো— "এসব কাজ তুমি কেনো করবে? তুমি একটা ল্যাপটপ কিনে আমার কাছে আসিও, আমি কাজ শিখে দিবো তুমি এর চেয়েও অনেক ভালো আয় করবে। কিন্তু তখন পরিবার আমাকে সাহায্য করেনি; ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রেখেছিল তবুও আমার জন্য ব্যয় করেনি। এই সময়ে আমি আরেকটা ফাঁদে পড়লাম। আমার মামা আমাকে তার কম্পিউটার অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করার জন্য দিলেন। যেহেতু সেটা ডেক্সটপ ছিল তাই আমি সেটা নিয়ে সেই প্রশিক্ষক এর কাছে যেতে পারলাম না। ফলে আমার কোনো শিক্ষক থাকলো না, আমি তার কাছে এবং এর ওর কাছে একটু একটু করে শুনে এসে ও বই পড়ে সেসব শিখতে লাগলাম। যেহেতু শিক্ষক নাই তাই একা একা শিখতে বেশ সময় লেগে গেল। যাহোক যখন অনেক কিছু শিখে গেলাম তখন আমার মামা কম্পিউটারটা ফেরৎ নিলেন। তাই সেটা ভেস্তে যায় আর তার পরেই কিছু লোকের মোটিভেশনে গলে গিয়ে BCS প্রিপারেশন শুরু করলাম। যার শেষে ফলাফল দাঁড়ালো এই। মানুষ কোনোকিছু না জেনেই পরামর্শ দেয়। তাই বাদবাকি জীবনে আর অন্যের পরামর্শ শুনছি না। নিজের বিশ্বাস থেকে কাজ করে যাবো।

আমি জীবনে কিছু করতে পারি আর নাই পারি এরূপ ভুল বিশ্বাস নিয়ে জীবন চালানোর বিষয়ে তরুণ প্রজন্মকে সতর্ক করে তুলতে পারলেই এটাকে সফলতা মনে করবো।

অবহেলা কী? এর প্রকৃতি ও স্বরূপ বিশ্লেষণ


ভাষাবিদরা বলে ভালোবাসার বিপরীত শব্দ ঘৃণা করা, কিন্তু আমি বলি ভালোবাসার বিপরীত শব্দ অবহেলা করা।
আর অবহেলা বড় মারাত্মক প্রতিক্রিয়াশীল একটা জিনিস। অবহেলা একজন মানুষকে তার সমাজ ও পরিবার থেকে কতটা দূরে ঠেলে দিতে পারে তা একটু গভীরভাবে ধ্যান করলে বুঝতে পারবেন।
মানুষ যখন তার খুব কাছের মানুষগুলোর দ্বারা অবহেলার শিকার হয় তখন সে সারা পৃথিবী ভালোবাসা খুঁজে বেড়ায়।

অবহেলা একজন মানুষকে মানসিক বন্দি বানিয়ে দেয়। অবহেলার ফলে মানুষ স্বপ্ন দেখার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
এই অবহেলার শিকার হয়ে আমি সারাটা জীবন এক মানসিক কারাগারে বন্দী হয়ে আছি। শুধু মাঝখানে দুই বছরের জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলাম। কারাগারের বন্দিরা তবুও বন্দি অবস্থার মুক্তি পাওয়ার পর নতুন করে সুন্দর জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু মানসিক বন্দীরা কোনো স্বপ্ন দেখতে পারেনা। রান্নাঘরে ধোঁয়া হলে যেমন শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তেমনি মানসিক বন্দীদের কাছে জীবনটাও শ্বাসকষ্টময় মনে হয়।

পানি পানি সর্বত্র পানি, কিন্তু পান করার মতো একফোঁটা পানিও নাই। মানসিক বন্দীদের জীবনটা হলো এমন, স্বপ্ন স্বপ্ন এত স্বপ্ন, কিন্তু বাস্তবায়ন করার মতো কোনো স্বপ্ন নেই; কারণ তার কোনো সাপোর্ট নেই, সে অবহেলার শিকার।

অবহেলিত হলে একজন মানুষের নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়। এই অবহেলিত মানুষটা যখন বুকে কষ্ট চেপে নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সে কেমন হবে সেটা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। দুঃসময় মানুষের আজীবন থাকে না, কিন্তু দুঃসময়ের অবহেলাগুলোর কথা আজীবন মনে থাকে।
অবহেলার ফলে সৃষ্ট কষ্টগুলো একজন মানুষকে পরিবারবিমুখ ও সমাজবিমুখ করে দেয়।

আমার এসব বলার উদ্দেশ্য নিজের অসারতাকে তুলে ধরা নয়, এর উদ্দেশ্য মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া জুনিয়রদের সতর্ক করা। কয়েল জ্বালানোর উদ্দেশ্য মশা তাড়ানো, কয়েল জ্বালানোর উদ্দেশ্য ধোঁয়া সৃষ্টি করা নয়, কিন্তু এতে ধোঁয়া সৃষ্টি না করে যেমন মশা তাড়ানো যায়না তেমতি এসব উদাহরণ না দিয়ে বিষয়টাকে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছেনা।

এখন বিষয় হলো, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা কীভাবে বুঝবে যে লাইফে সফলতা আসতে বিলম্ব হলে পরিবার একসময় অধৌর্য হয়ে সাপোর্ট দেওয়া বন্ধ করে দেবে ও সর্বোচ্চ লেভেলের অবহেলা করবে।
হ্যা, কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো কোনো পরিবারে থাকলে বুঝবে একদিন সেই পরিবার তোমাকে হেয় করবে ও তুমি অবহেলিত হবে।
তাই আমার জুনিয়রদের বলি, 'তোমরা সতর্ক হও, আমার মতো সমস্যা তোমাদের কারও আছে কিনা মিলিয়ে দেখো'—

১. ঘটনা যাই ঘটুক তা তোমার দোষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবেঃ বিষয়টা একটু ক্লিয়ার করি। কোনো কাজে কেউ সফল না হওয়ার পেছনে নিজের দোষ কিংবা অদক্ষতা ছাড়াও আরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কোনো দুর্ঘটনার কারণে কেউ কোনো কাজে ব্যর্থ হতে পারে। দুর্ভাগ্যের কারণেও কেউ কোনো কাজে ব্যর্থ হতে পারে, আবার সেই কাজ করতে গিয়ে কোনো প্রবলেম এর কারণেও সে সেই কাজে ব্যর্থ হতে পারে। আবার কোনো বিশেষ কারণেও সে সেই কাজে ব্যর্থ হতে পারে।
এক্ষেত্রে ন্যারো মাইন্ডের মূল্যায়ল হলো ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান না করে দুর্ঘটনা, দুর্ভাগ্য, প্রবলেম, বিশেষ কারণ যাহাই ঘটুক না কেনো সবকিছুকেই তার দোষ হিসেবে মূল্যায়ন করা।

২. তোমার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো উপেক্ষিত হবেঃ ফ্যামিলি যদি সবসময় আত্মীয়স্বজনের উৎসবাদি ও ফর্মালিটি নিয়ে ভাবাছন্ন থাকে। তোমার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো নজর এড়িয়ে যায় ও উপেক্ষিত হয় তাহলে বুঝবে চূড়ান্ত পর্যায়ে যেটা হবে সেটা হলো একসময় তারা তোমাকে ও তোমার স্বপ্নকে এড়িয়ে যাবে ও জীবনে সফলতা আসতে বিলম্ব হলে তারা তোমাকে সাপোর্ট দেওয়া বন্ধ করে দেবে।

৩. অন্যখানে উদ্ভব হওয়া রাগের প্রভাব তোমার উপর এসে পড়বেঃ যদি দেখতে পাও যে পরিবারের কর্তার এরূপ একটা উদ্ভট স্বভাব আছে তা হলো মাঠে বা অফিসে কোনো বিষয় নিয়ে তার রাগ উৎপন্ন হয়েছে এবং তা সে সেখানে দেখাতে না পেরে তা সেখানে চেপে রেখে বাড়িতে এসে পরিবারের লোকজনদের সাথে অযথাই রাগারাগি করছে তাহলে বুঝে নেবে সেই ফ্যামিলিতে তোমার ভবিষ্যৎ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

৪. তোমার অবর্তমানে তোমার মূল্যবান জিনিসপত্র অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাবেঃ দীর্ঘদিন বাইরে থাকার ফলে যদি দেখতে পাও বাড়িতে তোমার মূল্যবান জিনিসপত্র অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে, তোমার রাখা বইপুস্তক ছুঁচো ইঁদুর-উঁইপোকায় খেয়ে ফেলছে; তাহলে বুঝবে একসময় যখন তোমার সৃজনশীল উদ্যোগ সফলতার খুব কাছে, আরেকটু সাপোর্ট দরকার ঠিক সেই সময়টাতে তোমার সাপোর্ট পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

৫. তোমাকে সন্তানের মতো নয়, নিজ বাড়িতে শরণার্থীর মতো জীবন যাপন করতে হবেঃ তুমি যদি নিজ বাড়িতে সন্তানের মতো বেড়ে উঠার পরিবেশ না পেয়ে শরণার্থীর অবস্থানের মতো পরিবেশ পাও; কোনো হেতু ছাড়াই এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবেনা তাহলে বুঝে নিও তুমি সেই হতভাগা অবহেলিত সৃজনশীলদের দলে।

এখন বলতে হয়, তাহলে এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
আসলে অবহেলার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে এ থেকে পরিত্রাণের আর কোনো পথ থাকে না। তখন গ্রিক ট্রাজেডিই লাইফের প্রতিচ্ছবি।
তাই মধ্যবিত্তের সন্তানদের অল্প বয়সেই বাস্তবতার জ্ঞান লাভ করা জরুরি। শিক্ষক সমাজের উচিৎ হবে তাদেরকে দিবাস্বপ্ন না দেখানো। আর শিক্ষাব্যবস্থার গবেষকদের উচিত হবে স্কুলের জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষামূলক বইগুলোর ফেমিলার ভার্সন না দিয়ে মধ্যবিত্তদের জন্য স্পিসিফিক ভার্সন করে দেওয়া। সরকার অবশ্য তা করবে না, তাই আমার "সচেতনতার পাঠশালা" এর মাধ্যমে আমি তা করে যাবো।

ডেডিকেটেড ফ্যামিলি Vs কনজারভেটিভ ফ্যামিলি


লাইফের একটি রূঢ় বাস্তবতা হলো রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়া নম্র-ভদ্র সৃজনশীল ও স্বপ্নপ্রিয় সন্তানদের জীবনে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়; কারণ লাইফের দুঃসময়টাতে ফ্যামিলি তাদের পাশে থাকে না। তাই আগে থেকেই দুঃসময়ের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হয়। সেজন্য তরুণ বয়সেই (১৪-২০ বছর) একজন ছেলেকে তার ফ্যামিলি ডেডিকেটেড না কি কনজারভেটিভ তা জানা প্রয়োজন হয় এবং সেই মোতাবেক লাইফের পরিকল্পনা করতে হয়। সব পরিবার সন্তানের প্রতি ডেডিকেটেড হয় না, কিছু কিছু পরিবার সন্তানের প্রতি ভয়ানক রকমের কনজারভেটিভ হয়; তারা সন্তানকে ব্যবসার লাভ-ক্ষতির মতো করেই হিসেব করে। এখন আমরা ডেডিকেটেড ফ্যামিলি এবং কনজারভেটিভ ফ্যামিলি এর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করবো—

প্রথমে অল্প কথায় ডেডিকেটেড ফ্যামিলি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাক—
ডেডিকেটেড ফ্যামিলি তার সন্তানের জন্য ডেডিকেটেড। সে তার সন্তানের জন্যই সবকিছুর পরিকল্পনা করে। সে তার সন্তানের দুঃসময়ে পাশে থাকে। দোষ করলে ভুল ধরিয়ে দেয় এবং সংশোধন হওয়ার পথ দেখিয়ে দেয়। লাইফে কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে তা সমাধানের পদক্ষেপ নেয় যাতে ভবিষ্যতে সেক্ষেত্রে আবারও ব্যর্থতা না আসে। সন্তানের বস্তুগত ও মানসিক প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করে। নিজের দৈনন্দিন জীবনে যেরূপ মানসিক পরিস্থিতিই আসুক না কেনো তার প্রভাব সন্তানের উপর পড়তে দেয় না। মোটকথা সন্তানকে রূপকথার গল্পের সেই নিজের প্রাণপাখির মতো করে রাখে।

এখন আমরা কনজারভেটিভ ফ্যামিলির বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করবো।
তুমি যদি কনজারভেটিভ ফ্যামিলির সন্তান হয়ে থাকো তাহলে তোমার সাথে নিম্নোক্ত ঘটনাগুলো ঘটবে:—
১. ঘটনা যাই ঘটুক তা তোমার দোষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবেঃ বিষয়টা একটু ক্লিয়ার করি। কোনো কাজে কেউ সফল না হওয়ার পেছনে নিজের দোষ কিংবা অদক্ষতা ছাড়াও আরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কোনো দুর্ঘটনার কারণে কেউ কোনো কাজে ব্যর্থ হতে পারে। দুর্ভাগ্যের কারণেও কেউ কোনো কাজে ব্যর্থ হতে পারে, আবার সেই কাজ করতে গিয়ে কোনো প্রবলেম এর কারণেও সে সেই কাজে ব্যর্থ হতে পারে। আবার কোনো বিশেষ কারণেও সে সেই কাজে ব্যর্থ হতে পারে।
এক্ষেত্রে ন্যারো মাইন্ডের মূল্যায়ল হলো ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান না করে দুর্ঘটনা, দুর্ভাগ্য, প্রবলেম, বিশেষ কারণ যাহাই ঘটুক না কেনো সবকিছুকেই তার দোষ হিসেবে মূল্যায়ন করা।

একটা উদাহরণ দিই—
২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়ে একটা পরীক্ষা দেওয়ার পর অসুস্থ হলাম ও সেদিন বিকেলে ঢাবির রেজাল্ট হওয়ার পর দেখা গেলো অল্পের জন্য মেরিট লিস্টে আসতে পারিনি। এতে আরও ভেঙে পড়লাম, কারণ আমার লাইফে বরাবরই এই সমস্যা আছে, কোনোকিছু কাছাকাছি গিয়ে অল্পের জন্য হয়না। যাহোক একটু সুস্থ হওয়ার পর পরদিন সকালে সেদিন বিকেলে অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষাটা না দিয়েই বাড়িতে রওয়ানা হলাম। সঙ্গে বাবা ছিলেন। বাবা বাসের জানালার পাশে ছিলেন আর আমি যাতায়াতের পথটার সঙ্গে লাগা সিটে ছিলাম।
গাড়িতে কিছু লোকাল যাত্রী তুলেছিল ও আমার কাছে একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়েছিল। এই সময়ের একটা মুহূর্তে আমি গভীর চিন্তায় চলে যাই, তখন আমার দেহটাই শুধু বাসের সিটে পড়ে ছিল, আমি চিন্তার জগতে ছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাসে হাইড্রোলিক ব্রেক চাপানো হয় ও সেই বৃদ্ধা ছিটকে পড়ে যেতে ধরে, যেহেতু আমি অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় ছিলাম তাই আমি তাকে ধরতে পারিনি ও পাশে থাকা অন্য একজন ছেলে তাকে আটকায়।
তখন থেকেই আমার বিপক্ষে একটা শক্ত যুক্তি দাঁড় হয়ে গেলো যে, একটা বুড়ি মানুষ পড়ে যাচ্ছে তাকে এ আটকায় না, এ জীবনে কী করবে? এর পেছনে বেশি টাকা খরচ করে কী হবে?
কিন্তু আমি যে সেই কাজ করার মতো অবস্থায় ছিলাম না, তা বোঝার দরকার নাই; একটা বিশেষ কারণে একটা কাজ আমি করতে পারিনি, অথচ এটাও এখন এটা আমার দোষ!

আরেকটা ঘটনা, আমি একটা বিসিএস কোচিংয়ের অফিশিয়াল কাজে জয়েন করেছিলাম। সেখানে মাত্র কয়েকদিন ছিলাম। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও সেখানে টিকে থাকতে পারি নাই। আমার বংশগত সুত্রে পাওয়া উচ্চমাত্রায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ছিল। অফিসটা ছোট হওয়ায় নিজের ডেস্কে ঢুকতে ও বের হতে হলে আরও দুইজনকে উঠতে হতো, বিষয়টা বাসের জানালার পাশে বসা যাত্রীর বের হওয়ার মতো। শেষে আমি একদিন শরীরে গ্যাস আটকে রাখলাম; সন্ধ্যার দিকে আমার শরীর বিগড়ে গেলো ও মনেহলো শরীরের প্রতিটি কোষ বিষাক্ত হয়ে গেছে।
আমার আবার বংশগত সুত্রে পাওয়া আমাশয়ও আছে। কোষ্ঠকাঠিন্যের ঔষুধ খেলে আমাশয় হয়, আমাশয়ের ঔষুধ খেলে আবার কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।
ফলে আমার বডি সাপোর্ট না করায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও চাকরিটাতে টিকতে পানি নাই।
অথচ এই সমস্যাঘটিত বিষয়টাকেও আমার দোষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে; আমি নাকি ভণ্ডামি করে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।

অন্যদিকে আমার পূর্বপুরুষদের উপহার দেওয়া হাফ ডজন বংশগত রোগ আমার লাইফের সফলতার পথকে পাখির ডানা বেঁধে রাখার মতো বেঁধে রেখেছে।
মানুষ তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পায় সম্পদ, আশির্বাদ, চাকরির কোটা ইত্যাদি। আর আমি পেয়েছি আমাশয়, গ্যাস্ট্রিক, এলার্জি, চোখের রোগ, হরমোনাল রোগ ও ব্রেইন এর রোগ।
আমার ঢাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চাঞ্চ ফসকে গেছে শর্ট টাইম মেমোরি লসিং ও হ্যালোজিনেশন নামক দুটি বংশগত ব্রেইন রোগের কারণে।
মানুষ সবাই সফলতায় কৃতিত্ব নিতে চায়, কিন্তু কেউ ব্যর্থতার দায় নিতে চায় না। অধিকন্তু মানুষ সবসময় নিজের দোষ ও দায় অন্যের উপর চাপাতে অভ্যস্ত।
এভাবে লাইফের প্রতিটি ঘটনাতেই দেখা যায় আমার কোনো দোষ না থাকলেও সেটাকে আমার দোষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।

২. তোমার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো উপেক্ষিত হবেঃ ফ্যামিলি যদি সবসময় আত্মীয়স্বজনের উৎসবাদি ও ফর্মালিটি নিয়ে ভাবাছন্ন থাকে। তোমার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো নজর এড়িয়ে যায় ও উপেক্ষিত হয় তাহলে বুঝবে চূড়ান্ত পর্যায়ে যেটা হবে সেটা হলো একসময় তারা তোমাকে ও তোমার স্বপ্নকে এড়িয়ে যাবে ও জীবনে সফলতা আসতে বিলম্ব হলে তারা তোমাকে সাপোর্ট দেওয়া বন্ধ করে দেবে।

৩. অন্যখানে উদ্ভব হওয়া রাগের প্রভাব তোমার উপর এসে পড়বেঃ যদি দেখতে পাও যে পরিবারের কর্তার এরূপ একটা উদ্ভট স্বভাব আছে তা হলো মাঠে বা অফিসে কোনো বিষয় নিয়ে তার রাগ উৎপন্ন হয়েছে এবং তা সে সেখানে দেখাতে না পেরে তা সেখানে চেপে রেখে বাড়িতে এসে পরিবারের লোকজনদের সাথে অযথাই রাগারাগি করছে তাহলে বুঝে নেবে সেই ফ্যামিলিতে তোমার ভবিষ্যৎ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

৪. তোমার অবর্তমানে তোমার মূল্যবান জিনিসপত্র অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাবেঃ দীর্ঘদিন বাইরে থাকার ফলে যদি দেখতে পাও বাড়িতে তোমার মূল্যবান জিনিসপত্র অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে, তোমার রাখা বইপুস্তক ছুঁচো ইঁদুর-উঁইপোকায় খেয়ে ফেলছে; তাহলে বুঝবে একসময় যখন তোমার সৃজনশীল উদ্যোগ সফলতার খুব কাছে, আরেকটু সাপোর্ট দরকার ঠিক সেই সময়টাতে তোমার সাপোর্ট পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

৫. তোমাকে সন্তানের মতো নয়, নিজ বাড়িতে শরণার্থীর মতো জীবন যাপন করতে হবেঃ তুমি যদি নিজ বাড়িতে সন্তানের মতো বেড়ে উঠার পরিবেশ না পেয়ে শরণার্থীর অবস্থানের মতো পরিবেশ পাও; কোনো হেতু ছাড়াই এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবেনা তাহলে বুঝে নিও তুমি সেই হতভাগা অবহেলিত সৃজনশীলদের দলে।

৬. তোমার দুর্দিনে তুমি একা হয়ে যাবে: কনজারভেটিভ ফ্যামিলিতে তোমার দুঃসময়ে তুমি একা হয়ে যাবে। তোমার লাইফ নিয়ে ভাবার কেউ থাকবে না অর্থাৎ তোমাকে নিয়ে ভাবার সময় কারো থাকবে না; টিভি দেখা, গল্পসল্প করে বেড়ানো, অন্যের ভলান্টিয়ারগিরি করার সময় থাকবে অথচ তোমার লাইফ নিয়ে ভাবার ইচ্ছা কারো থাকবে না।

অতএব, আমরা ডেডিকেটেড ফ্যামিলি ও কনজারভেটিভ ফ্যামিলি এর মধ্যে মোটামুটিভাবে নিম্নোক্ত পার্থক্যগুলো দেখতে পাই—
১. ডেডিকেটেড ফ্যামিলি হলো ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানকারী আর কনজারভেটিভ ফ্যামিলি হলো দোষ আরোপকারী।

২. ডেডিকেটেড ফ্যামিলি ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়, যেমন— আমার এক চাচা তার ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ৬ বিষয়ে ফেল করে; তাই তিনি এর কারণ অনুসন্ধান করেন এবং বিভিন্নজনের পরামর্শ নিয়ে ছেলেকে একটা আবাসিক কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দেন ফলে সে ভালো সাপোর্ট পেয়ে এসএসসিতে ৪.৫ এর উপরে রেজাল্ট করে।
অন্যদিকে কনজারভেটিভ ফ্যামিলি ব্যর্থতার জন্য সন্তানকে দোষারোপ করে আর্থিক বরাদ্দ ও অন্যান্য সুবিধা কমিয়ে দেয়। যেমন— আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় গণিতে এ+ পাই। কিন্তু ৭ম শ্রেণির গণিতে খারাপ করি বলে গণিত প্রাইভেটের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয় ও তা কমিয়ে দুই মাস করা হয়।

৩. ডেডিকেটেড ফ্যামিলি তার সন্তানের দুর্দিনে তার পাশে দাঁড়ায়, অন্যদিকে কনজারভেটিভ ফ্যামিলি তার সন্তানের দুর্দিনে মীরজাফরের বাহিনীর মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে কিংবা অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যায়; অনেক সময় দেখেও না দেখার ভান করে।

৪. ডেডিকেটেড ফ্যামিলি তার সন্তানের দরকারি জিনিস সরবরাহের জন্য কোনো সম্পদ বিক্রি করে হলেও তা পূরণ করে থাকে আর কনজারভেটিভ ফ্যামিলি প্রথমে সেটা দেবে বলে মিথ্যা আশ্বাস দেয় তারপর দিনের পর দিন যার, মাসের পর মাস যায়, বছরের পর বছর যায় দিবে দিবে বলে সময় পার করে আসলে দেয় না।

৫. ডেডিকেটেড ফ্যামিলি তার সন্তানের লেখাপড়া ও লাইফের উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করাকে ইনভেস্ট মনে করে আর কনজারভেটিভ ফ্যামিলি তার সন্তানের এসব ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করাকে অনর্থক ব্যয় মনে করে।

৬. ডেডিকেটেড ফ্যামিলি তার সন্তানের জন্য বেশি সময় দেয়, সন্তানের লাইফ নিয়ে চিন্তা ও গবেষণায় মগ্ন থাকে আর কনজারভেটিভ ফ্যামিলি আত্নীয়স্বজন, সমাজ, পাড়া প্রতিবেশি ইত্যাদিতে নিজের ইমেজ ভালো রাখতে সদা তৎপর থাকে ও সেখানে বেশি প্রচেষ্টা ব্যয় করে এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কর্মকাণ্ড করে বেড়ায়, সন্তানের লাইফ নিয়ে ভাবার সময় তাদের থাকে না।

৭. ডেডিকেটেড ফ্যামিলি সন্তানের দুর্দিনে তাকে মানসিক সাপোর্ট দেয় আর কনজারভেটিভ ফ্যামিলি সন্তানের দুর্দিনে উল্টো তার সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং যে গাছে ফল ধরে না সেই গাছ যেমন কেটে ফেলা হয় তেমনি তাকেও আনপ্রডাকটিভ হিসেবে মূল্যায়ন করে দূরে সরে দেয়।

মোটকথা, ডেডিকেটেড ফ্যামিলির চিন্তাভাবনা হলো "সন্তানের জন্য আমরা" আর কনজারভেটিভ ফ্যামিলির চিন্তাভাবনা হলো "আমাদের প্রয়োজনে সন্তানাদি"; অর্থাৎ, ডেডিকেটেড ফ্যামিলি হলো সন্তানের প্রতি ভলান্টিয়ার মাইন্ডেড আর কনজারভেটিভ ফ্যামিলি হলো ব্যবসায়ীক মাইন্ডেড।

তবে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি আশার কথা হলো বর্তমানকালে প্রায় সব ফ্যামিলিই ডেডিকেটেড ফ্যামিলি; অতি অল্প কিছু কনজারভেটিভ ফ্যামিলিই সমাজে রয়েছে। আর সেসব কনজারভেটিভ ফ্যামিলির সৃজনশীল সন্তানেরা লাইফের সফল ও ফলপ্রসূ পরিকল্পনা করার বিষয় পরামর্শ নিতে অবশ্যই আমাদের Advice Desk এ আসবেন।

Tuesday, April 13, 2021

রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট


এটা সত্য যে কনজারভেটিভ ফ্যামিলির সন্তানদের রিসোর্স বলে কিছু থাকে না। তারা অর্থসম্পদ এর দিক দিয়ে প্রায় শূন্য মানুষ হয়ে থাকেন। তারপরও নিজের যে অ্যাবিলিটি থাকে সেটিই তার রিসোর্স; আর এই রিসোর্স প্রয়োগ করেই প্রাথমিক কিছু অর্থসম্পদ অর্জন করে সেকেন্ডারি লেভেলে গিয়ে একটি ফলপ্রসূ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট করতে হবে।
তুমি দুই টাকা আয় করার মতো যে কাজটা করতে পারো তরুণ বয়সে পড়াশুনার পাশাপাশি সেটা করেই আয় করে অর্থ সঞ্চয় করা শুরু করো। কারণ দুর্দিনে এটাই সাপোর্ট দিবে এবং এটাই লাইফের পরবর্তী বড় পরিকল্পনা করতে সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে সমাজের মানুষের কোনো মন্তব্যকে গায়ে মাখিও না; তারা কেউ তোমাকে দুই টাকা দিয়ে হেল্প করে না।
তুমি পুরোপুরি শূন্য মানুষ হয়ে থাকলে এবং কোনোকিছু শুরু করার মতো কোনোই সাপোর্ট না পেয়ে থাকলে প্রথমে কোনো ক্যাম্পেইন জব কিংবা রাজমিস্ত্রিদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতে পারো। এরপর সেখান থেকে কিছু টাকা আয় করে তা দিয়ে ইলেক্ট্রিক মেকানিক্যাল এর ট্রেনিং নিতে পারো, এতে তোমার আয় বাড়বে এবং অল্প সময়ে বেশি আয় করার সুযোগ আসবে; এক্ষেত্রে যদি ট্রেনিং নেওয়ার পরে তুমি কাজের অর্ডার না পাও তাহলে তোমাকে কাজের অর্ডার পেতে ডিজিটাল মার্কেটিং এর মাধ্যমে সাহায্য করবে লাইফ একাডেমির মাল্টিপারপাস ক্লাইন্ট সেভিং প্রজেক্ট। এছাড়াও তুমি রংমিস্ত্রি কিংবা পানির পাইপলাইনের মিস্ত্রির সঙ্গে থেকে সেই কাজ শিখে টাকা জমাতে পারো। এরপর টাকা জমিয়ে ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিং নাও এবং ফ্রিল্যান্সিং করার যন্ত্রপাতি কিনে নাও। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বহু প্রকারের কাজ পাবে। সেসব কাজের যেটা করে তুমি সুবিধামতোভাবে আয় করতে ও পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারবে সেরূপ একটা কাজ করো এবং পড়াশুনা ও অর্থসঞ্চয় চালিয়ে যাও।
আমাকে আর কিছুই বলতে হবে না, তোমার বাদবাকি পথ তুমি নিজেই তৈরি করে নিতে পারবে।



আঞ্চলিক কমিউনিকেশন মিডিয়া তৈরি করে আয় করতে চাও?
তাহলে একটি নমুনা দেখতে পৃথিবীর প্রথম আঞ্চলিক কমিউনিকেশন মিডিয়া 'চতরাপিডিয়া' এর ওয়েবপেজ দেখে নাও।
চতরাপিডিয়ার ওয়েবপেজ ভিজিট করতে এখানে এখানে—ক্লিক—করো

Chatrapedia — Simplifying Life